আজ: মঙ্গলবার | ২৬ অক্টোবর, ২০২১ | ১০ কার্তিক, ১৪২৮ | ১৯ রবিউল আউয়াল, ১৪৪৩ | দুপুর ১২:১০

সংবাদ দেখার জন্য ধন্যবাদ

Home » সারাদেশ » চট্টগ্রাম বিভাগ » কুমিল্লা » কুমিল্লায় কাভার্ডভ্যানচাপায় নিহত ২

একটি কণ্ঠস্বরাশ্রিত বিশ্লেষণধর্মী বই

২৫ আগস্ট, ২০২১ | ১১:৩৬ পূর্বাহ্ণ | বাংলাদেশ বার্তা | 517 Views

প্যানডেমিক করোনায় বিপর্যস্ত বিদেশ বিভুঁইয়ের এক শহরে মৃত্যু হতে নিঃশ্বাস দূরত্বে দাঁড়িয়ে একজন মানুষ এক অসহায় পৃথিবীর গল্প বলে গেছেন। এটি শুধু আর্তপীড়িতদের বই নয়, বরং মৃত্যুর দমবন্ধ সেই সময়ে মানুষ তার আত্মিক, শারীরিক, সামাজিক ও দৈনন্দিন জীবনে যে সাহসের স্বাক্ষর রেখেছে তার দৃষ্টিকোণ হতে এটা অনেক মোটিভেশনাল প্রেরণাদায়ী একটি বই। এই বইয়ের লেখক ইব্রাহিম চৌধুরী আমেরিকা প্রবাসী একজন বাঙালি। বইয়ের নাম শিরোনামে যেহেতু নিউইয়র্কের নাম উঠে এসেছে, তাই বইয়ে প্রতিপাদ্য করোনাকালীন সমাজের অবস্থান সহজে’ই অনুমেয়।

লেখক ইব্রাহিম চৌধুরী সম্পর্কে বলতে গেলে খুব তাড়াহুড়ো অথবা সংক্ষিপ্ত আকারে যেটুকু না বললেই নয় তা হচ্ছে। বর্তমানে আমেরিকা প্রবাসী এই লেখক মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশ যে মানুষগুলো খেটে খাওয়া মানুষের অধিকার নিশ্চিত করতে, উত্পাদনের উপায় সমূহের উপর মালিকানার দাবি নিশ্চিত করতে, অনেক চড়াই-উতরাই, অনেক অত্যাচার সহ্য করেছেন তিনি তাদেরই এক প্রতিনিধি।

সদ্য স্বাধীন দেশে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন অথবা পুঁজিবাদী, বুর্জোয়া সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে তাদের যে লড়াই ছিল, সে সম্পর্কে তাদের মূল্যায়ন কি হতে পারে আমি বলতে পারব না। কিন্তু তাদের উত্তর পুরুষ হিসেবে আমি তাদের ঋণ স্বীকার করে যাওয়ার প্রয়োজন উপলব্ধি করি। আর সেই প্রয়োজন থেকে আজও মনে করি, আপনারা ব্যর্থ নন, বিপ্লব কখনো ব্যর্থ হতে পারে না, যদি সত্যি হতো তবে বাংলাদেশ বসে আজ আমি অথবা আমরা মহামারি করোনা ডেটলাইন নিউইয়র্ক বই নিয়ে আলোচনা করতাম না।

ইব্রাহিম চৌধুরী বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক প্রথম আলোর উত্তর আমেরিকার দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন। প্রথম আলোর উত্তর আমেরিকা প্রতিবেদকদের সমন্বয় করেন তিনি।

করোনাকালীন সময়ে পত্রিকায় প্রকাশিত তাদের রিপোর্টের আদলেই উপজীব্য হয়ে উঠেছে মহামারি করোনা ডেটলাইন নিউইয়র্ক গ্রন্থখানি। যেহেতু প্রথম আলো বাংলা পত্রিকা এবং তার প্রতিবেদকরা বাঙালি, তাই প্রকাশিত রিপোর্টে আমেরিকা প্রবাসী বাঙালিদের যাপিত জীবনই প্রাধান্য পেয়েছে বেশি, সেইসাথে উঠে এসেছে করোনাকালীন সময়ে আমেরিকার সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক জীবনের প্রতিচ্ছবি।

১ মার্চ ২০২০ তারিখে নিউইয়র্কে প্রথম করোনা ভাইরাস সংক্রমণের যে খবর আসে তার প্রতিক্রিয়ায় স্থানীয় গভর্নরের ভাষায় ফুটে ওঠে পৃথিবীর সব ক্ষমতাবান মানুষের দম্ভোক্তি। করোনা ভাইরাস মারাত্মক আকার ধারণ করার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেন গভর্নর ও অন্যান্য কর্মকর্তারা। তারা আরো একধাপ এগিয়ে বলেন এ নিয়ে বিস্মিত অথবা শঙ্কিত হবার কিছু নেই। ক্ষমতাসীন গভর্নর ও অন্যান্য কর্মকর্তাদের এই বক্তব্য খুবই অনুমিত। আমাদের দেশেও হরহামেশাই ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার প্রয়োজনে এ রকম মিথ্যা আস্ফোলন হয়ে থাকে।

আমাদের দেশের রাজনীতিবিদদের সাথে আমেরিকার রাজনীতিবিদদের যে পার্থক্য, লেখক চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন। তা হলো জনস্বাস্থ্যে আমেরিকার রাজনীতিবিদেরা কতটুকু সতর্ক, কতটুকু নিবেদিতপ্রাণ। ১ মার্চ গভর্নর দম্ভোক্তি করে বলেছিলেন, করোনা ভাইরাস মারাত্মক আকার ধারণ করার সম্ভাবনা নেই। ২৩শে মার্চ সংক্রমণের সংখ্যা ১৫ হাজার ছাড়িয়ে যাওয়ার পরে সেই গভর্নর অ্যান্ড্রু কুমো ও নগরীর মেয়র কেন্দ্রীয় সরকারের তত্পরতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

আমাদের সংস্কৃতিতে লাশ গায়েব করে মৃত্যু হার কম দেখিয়ে সরকারের সফলতা তুলে ধরা যেখানে ক্ষমতাসীনদের একটি উপায়, সেখানে নিউইয়র্ক শহরের মেয়র বলেন— হাসপাতালে আসার আগেই নগরের যেসব মানুষ করোনা ভাইরাসে মারা গেছেন তাদের হিসাব এখনো জানা যায়নি। এ নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে, উল্লেখিত ঘটনার মাধ্যমে লেখক আমাদের গণতন্ত্র ও আমেরিকার গণতন্ত্রের মধ্যে যে মৌলিক পার্থক্য তা দিবালোকের মত পরিষ্কার করে দেখিয়ে দিলেন।

ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে। বাঙালি আমেরিকায় গিয়ে করোনা ভাইরাসে স্কুল বন্ধ হয়েছে বলে বাচ্চাদের নিয়ে বেশ কয়েকটি পরিবার একসঙ্গে হয়েছিলেন। যাদের মধ্যে পরে অনেকেই করোনা আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং দুজন নাকি মারাও যান। এর বাইরে লেখক তার বইয়ে বাঙালীদের নিয়ে গর্ববোধ করার মতো যে গল্পের অবতারণা করেছেন, তা হলো বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন অব নর্থ আমেরিকা (বামনা) টেক্সাস চ্যাপ্টার অন্য পেশাজীবীদের নিয়ে বাঙালিদের জন্য সার্বক্ষণিক হটলাইন চালু করার খবর।
আফসোস, আমাদের দেশে ও তো ডক্টর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব) আছে। কই তাদের এ রকম কোনো কার্যক্রম চোখে পড়েনি।

প্যানডেমিক করোনা মহামারীতে পৃথিবীজুড়ে যেখানে বেকার মানুষের সংখ্যা বানের জলের মতো দিকবিদিক বেড়ে চলেছে সেখানে করোনা বিপর্যস্ত অর্থনীতি ও মন্দার মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্রে হাজার হাজার মানুষকে কাজে নিয়োগের জন্য অফার দিচ্ছে বেশ বড়ো-বড়ো করপোরেট কোম্পানি। এই সংবাদে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো কতটুকু জনস্বার্থে নতজানু তার প্রমাণ পাওয়া যায়।

এই বইয়ে যখন দেখি জ্যাকসন হাইটসে মোহাম্মদী সেন্টারে মাহে রমজানের প্রথম থেকে ফেস টাইমে লাইভ স্ট্রিম এর মাধ্যমে নিউইয়র্ক সময় রাত ১০টায় তারাবি দুপুর ২টায় জুমার নামাজ সম্প্রচার করে আসত, এবং তাতে নিউইয়র্ক কানাডাসহ আশপাশের বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন নগরীর বিপুলসংখ্যক মুসল্লি অংশ নিতেন এবং নামাজ আদায় করতেন। তখন আরো সতর্ক হই, আবেগ থেকে সরে এসে জীবনমুখী হতে শিখি। কারণ আমরা বাংলাদেশে মসজিদ খুলে দেয়ার জন্য প্রতিবাদ করেছি।

১৩ মে ১৬৬ জনের মৃত্যু সংবাদ জানিয়ে নিউইয়র্কের রাজ্য গভর্নর অ্যন্ড্রু কুমো যখন উচ্চারণ করেন, এ শুধু সংখ্যা নয় এক-একটি জীবন। বুকে খুব লাগে, কারণ মানুষের প্রথম এবং সম্ভবত একমাত্র মৌলিক দায়িত্ব হচ্ছে মানুষের বেঁচে থাকা নিশ্চিত করা। আমরা কি নিউইয়র্কের গভর্নরের মতো আরেকটু মানবিক হতে পারি না! আমাদের দেশে লকডাউন কার্যকর করার জন্যে জেল- জরিমানা, লাঠিচার্জ ও যেখানে কাজ দিচ্ছে না সেখানে তারা শুধু বিদ্যুতের কানেকশন অফ করে মানুষকে ঘরমুখো করে নিচ্ছে, ভাবা যায়! জনগণকে শাসন করার কাজে সহিংস দমননীতি যে কোনো অবস্থায় ন্যায়সঙ্গত নয়, এর প্রমাণ লেখকের এই বইয়ের উদ্ধৃতি।

এতসব আর্ত-ভারাক্রান্ত উপখ্যান পাড়ি দিয়ে এক সময় লেখকের কলমে ফিরে আসে আবার জেগে উঠা নিউইয়র্ক শহরের গল্প। গল্পের পেছনে সরকার, স্বাস্থ্যকর্মী, জনপ্রশাসন ও সাধারণ মানুষের সুশৃঙ্খল সহযোগিতা, সর্বোপরি শ্রেণি বৈষম্য, রাজনৈতিক বিভেদ ভুলে গিয়ে দেশের এমন ক্রান্তিলগ্নে সব মানুষ দল-মত নির্বিশেষে ঐক্য। তর্ক-বিবাদের ঊর্ধ্বে জাতীয় ঐক্যের যে নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন তা আমাদের জন্য শিক্ষণীয়।

আমি জানি আমেরিকার জনমানুষের কালচার আমরা ডেভেলপ করতে পারিনি অথবা তাদের মতো আমাদের গণতন্ত্র এত টেকসই নয়, যার কারণে নিউইয়র্কের মেয়র অথবা রাজ্য গভর্নরের মতো আমাদের রাজনীতিবিদরা জবাবদিহিতার প্রয়োজন অথবা জবাবদিহি করেও থাকেন না। তবুও ‘করোনা মহামারি ডেটলাইন নিউইয়র্ক’ বই পড়ে আমার মধ্যে সর্বক্ষেত্রে জবাবদিহিতা অথবা সবচেয়ে বেশি জনস্বাস্থ্য’কে গুরুত্ব দেয়ার আকাঙ্ক্ষা জেগে উঠেছে। ভেতরে ভেতরে যে তৃষ্ণা অনুভব করছি, আস্তরণে লেগে থাকা জলের প্রলেপের মতো মহামারী করোনা ডেটলাইন নিউইয়র্ক বই হতে এই আকাঙ্ক্ষা এই তৃষ্ণাটুকু নিলাম।

জানি আমাদের ঐকান্তিক ইচ্ছাই একদিন আমাদের কূলে ভেড়াতে পারবে এর জন্য সময়ের প্রয়োজন, আমাদের যে সমাজব্যবস্থা নিয়ে এতো আক্ষেপ তা কিন্তু একদিন, এক মাস, এক বছর অথবা এক যুগে গড়ে ওঠেনি যে এটা আচমকা বদলে যাবে, আমাদের এই ভঙ্গুর, ক্ষত-বিক্ষত প্রায় সমাজব্যবস্থা এটা আমাদের হাজার বছরের অপসংস্কৃতির ফসল, এই সমাজকে বদলাতে হলে যুগের সঞ্চিত শক্তির প্রয়োজন। আর যে উপায় সমাজকে বদলাতে হবে তার পুঙ্খানুপুঙ্খ উদাহরণ আছে ইব্রাহিম চৌধুরীর ‘মহামারি করোনা : ডেটলাইন নিউইয়র্ক’ বইয়ে।



Comment Heare

Leave a Reply

Top
%d bloggers like this: