আজ: রবিবার | ২৭শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ | ১২ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ | ১০ই সফর, ১৪৪২ হিজরি | দুপুর ১:০৮
শিক্ষা

‘তবু আমারে দেব না ভুলিতে’

বাংলাদেশ বার্তা | ২৭ আগস্ট, ২০২০ | ১১:৪৬ পূর্বাহ্ণ

জন্ম ১৩০৬, মৃত্যু ১৩৮৩ বঙ্গাব্দ। অঙ্কের হিসাবে কাজী নজরুল ইসলামের জীবনকাল ৭৭ বছরের। কিন্তু সৃষ্টিশীল ছিলেন মাত্র ২৩ বছর। এই ২৩ বছরের সাহিত্য-জীবনে তার বিপুল সৃষ্টিকর্ম বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। তার ছড়ানো দ্রোহী চেতনা কাঁপিয়ে দিয়েছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ভিত।

‘আমি চির বিদ্রোহী বীর/বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা চির উন্নত শির’- নিজের লেখা কালোত্তীর্ণ কবিতা ‘বিদ্রোহী’তে এভাবেই আত্মপরিচয় তুলে ধরেছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। তাই খ্যাতি পেয়েছেন বিদ্রোহী কবির। অভিষিক্ত হয়েছেন বাংলাদেশের জাতীয় কবির মর্যাদায়।

তার সাহিত্যকর্মে ভালোবাসা, মুক্তি এবং বিদ্রোহ প্রাধান্য পেলেও ধর্ম ও লিঙ্গভেদ অনুভূতির স্থান রয়েছে। তার এই সাহসী লেখনী ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষকে উজ্জীবিত করেছে। প্রবল প্রাচুর্যে পরিপূর্ণ, ছন্দোবৈচিত্র্যময় কাব্য সৃষ্টি, আবেগমিশ্রিত গান ও নানা রচনাবলি তাকে করেছে বাংলা শিক্ষিত সমাজে অলোকসামান্য প্রতিষ্ঠা-দান।

‘বিদ্রোহী’ কবিতা দিয়ে হৃদয় জয় করেছেন বাঙালির হৃদয়। পেয়েছেন বিদ্রোহী কবির খেতাব। তবে বিদ্রোহী কবির মর্যাদা পেলেও মূলত তিনি চিরকালের প্রেমের কবি। তার এই প্রেম ছিল সব অর্গলমুক্ত, সর্বব্যাপী। যার কেন্দে ছিল উদার মানবিকতা। এ কারণে সব ধর্মের মানুষের কাছে তিনি পেয়েছেন সমান মর্যাদা।

বাংলা সাহিত্যে তার অবদান অসামান্য। মহাপ্রয়াণের ৪৪ বছর পরেও তার প্রয়োজনীয়তা এতটুকু ম্লান হয়নি। বরং চিরস্থায়ী হয়ে আছেন কোটি-বাঙালি হৃদয়ে এই অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদী ও সাম্যের কবি। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তিনি এক নতুন ধারার জন্ম দেন। এটি হলো ইসলামী সংগীত তথা গজল। নজরুল প্রায় তিন হাজার গান রচনা এবং সুর করেছেন।

জীবদ্দশায় তিনি সর্বদা হিন্দু-মুসলাম মিলনের গান গেয়েছেন। তাই তো তার ইসলামী সংগীত ও গজল আজও হৃদয় হরণ করে নেয়। ‘ও মন রমজানের ওই রোজার শেষ এলো খুশি’- গানটি তারই রচনা। পাশাপাশি তিনি সিদ্ধহস্ত ছিলেন হিন্দুদের শ্যামাসঙ্গীত রচনার ক্ষেত্রেও। তবে তার রচনায় বিশেষভাবে প্রকাশ পায় শোষিত, বঞ্চিত ও নিপীড়িত মানুষের আর্তি।

গণমানুষকে তিনি উদ্বুদ্ধ করেছেন সাম্য ও ন্যায়ের বন্ধনে একত্রিত হয়ে শোষণ, বঞ্চনা ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সংগ্রামে লিপ্ত হতে। তাই তিনি গেয়েছেন ‘গাহি সাম্যের গান/ মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান’।

অসাম্য, অসুন্দর ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন অকান্ত বিদ্রোহী-চির উন্নত শির। দ্রোহ-প্রেম-মানবিকতায় অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও প্রগতির এক উজ্জ্বল প্রেরণার এই শ্রেষ্ঠতম পুরুষ লিখেছেন ‘যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না, অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভিম রণ-ভ‚মে রণিবে না’-বিদ্রোহী রণ-কান্ত/ আমি সেই দিন হব শান্ত।’ তার এ লেখনিই শোষিত-বঞ্চিত মানুষের মুক্তির পক্ষে সোচ্চার কণ্ঠের উৎকৃষ্ট উদাহরণ। বাংলা কাব্যে এক নতুন যুগের স্রষ্টা বলা হয় নজরুলকে।

যিনি পরাধীন ব্রিটিশ ভারতে মুক্তির বাণী বয়ে এনেছিলেন তার কাব্যে। সূচনা করেছিলেন এক নতুন যুগের। ‘অগ্নিবীণা’, ‘বিষের বাঁশি’ আর ‘ভাঙ্গার গান’ গেয়ে জাগিয়ে তুলেছিলেন তিনি গোটা উপমহাদেশের মানুষকে। তবে উল্কার মতো এসে আবার উল্কার মতো মিলিয়ে গেলেন বাকশক্তি হারিয়ে। দীর্ঘায়ু পেলেও তার সাহিত্যজীবন মাত্র ২৩ বছরের।

এ স্বল্প পরিসর জীবনে নজরুলের বিপুল সৃষ্টিকর্ম বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। কবি ছিলেন কর্মে ও চিন্তায় স্বাধীন। দাসত্বের বন্ধনমুক্তি ও প্রাচীন সংস্কারের শৃঙ্খল ভঙ্গ করবার কামনা উন্মোদ। তার সৃজনশীল জগতে এসব প্রকাশ পেয়েছে পরতে পরতে। কাব্যের বাণী, গানের কথা কিংবা ক্ষুরধার লেখনী বুলেটের চেয়ে শক্তিশালী ছিল।

তৎকালীন সময়ে তার বাণী, কথা ছিল বিরোধীদের কাছে চক্ষুশূলের মতো। পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার পাশাপাশি তিনি সামাজিক বৈষম্য, শোষণ, বঞ্চনা, কুসংস্কার, সাম্প্রদায়িকতা, হীনম্মন্যতার বিরুদ্ধেও রুখে দাঁড়াতে উদ্বুদ্ধ করেছেন- গাহি সাম্যের গান-/যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান/যেখানে মিশেছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম-খ্রিস্টান’। তিনি এমন একটা শোষণহীন সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন যেখানে- সকল কালের সকল দেশের সকল মানুষ আসি/এক মোহনায় দাঁড়াইয়া শোনে এক মিলনের বাঁশি।

জন্মস্থান ভারতের বর্ধমান হলেও বাংলাদেশের সঙ্গে কবি নিবিড় সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। কৈশোরের একটা সময় কেটেছে ময়মনসিংহের ত্রিশাল-দরিরামপুরে। কুমিল্লায় তার শ্বশুরবাড়ি। ঢাকা ও চট্টগ্রামে কেটেছে তার আনন্দ-বেদনার অনেক দিন। শৈশবে পিতৃহারা হন নজরুল। তারপর বাধার দুর্লঙ্ঘ পর্বত পাড়ি দিতে হয়েছিল তাকে। অতঃপর একদিন সবাইকে চমকে দিয়ে বাংলার সাহিত্যাকাশে দোর্দন্ত প্রতাপে আত্মপ্রকাশ করেন কবি। কবিরূপে নজরুলের এ অভ্যুদয় ধুমকেতুর সঙ্গেই তুলনীয় কেবল। কবিগুরু রবীন্দ ুর্গশিরে উড়িয়ে দে তোর বিজয় কেতন।’

কাজী নজরুল ইসলাম দুই বাংলায় সমভাবে সমাদৃত। তার প্রসঙ্গে কবি অন্নদাশঙ্কর রায় বলেছেন, ‘ভুল হয়ে গেছে বিলকুল/আর সবকিছু ভাগ হয়ে গেছে/ভাগ হয়নিকো নজরুল/এই ভুল টুকু বেঁচে থাক/বাঙালি বলতে একজন আছে/দুর্গতি তার ঘুচে যাক।’ কাজী নজরুল ইসলামের যুগান্তকারী এক কবিতা হলো ‘বিদ্রোহী’।

এই কবিতার মধ্য দিয়ে নজরুল সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। একই সময় রচিত তার আরেকটি বিখ্যাত কবিতা হচ্ছে ‘কামাল পাশা’। এই কবিতাটিতে ভারতীয় মুসলিমদের খিলাফত আন্দোলনের অসারতা সম্বন্ধে নজরুলে দৃষ্টিভঙ্গি এবং সমকালীন আন্তর্জাতিক ইতিহাস-চেতনার পরিচয় পাওয়া যায়। ১৯২২ সালে তার বিখ্যাত কবিতা-সংকলন ‘অগ্নিবীণা’ প্রকাশিত হয়। এই কাব্যগ্রন্থটি বাংলা কবিতায় এক নতুন ধারার সৃষ্টি করে।

নজরুলের প্রথম গদ্য রচনা ‘বাউণ্ডুলের আত্মকাহিনী’। ১৯১৯ সালের মে মাসে এটি সওগাত পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। তার লেখা অন্যান্য গদ্যের মধ্যে রয়েছে ‘হেনা’, ‘ব্যথার দান’, ‘মেহের নেগার’, ‘ঘুমের ঘোরে’। ১৯২২ সালে নজরুলের একটি গল্প সংকলন প্রকাশিত হয়; যার নাম ‘ব্যথার দান’। এছাড়া একই বছর প্রবন্ধ-সংকলন ‘যুগবাণী’ও প্রকাশিত হয়।

নজরুলের সাহিত্যকর্মের মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য তার গান। তার লেখা নজরুল গীতি বা নজরুল সঙ্গীত বলে পরিচিত। তার লেখা গানগুলো ১০টি ভাগে বিভাজ্য। এগুলো হলো-ভক্তিমূলক গান, প্রণয়গীতি, প্রকৃতি বন্দনা, দেশাত্মবোধক গান, রাগপ্রধান গান, হাসির গান, ব্যঙ্গাত্মক গান, সমবেত সঙ্গীত, রণসঙ্গীত এবং বিদেশিসুরাশ্রিত গান। তার রচিত ‘চল চল চল, ঊর্ধ্বগগনে বাজে মাদল’ বাংলাদেশের রণসঙ্গীত। কবি নজরুল ধ্যানে-জ্ঞানে, নিশ্বাসে-বিশ্বাসে, চিন্তাচেতনায় ছিলেন পুরোদস্তুর অসাম্প্রদায়িক। যখন সাম্প্রদায়িকতার বিষবৃক্ষে জাতিগত বিভেদ সৃষ্টি হচ্ছে, তখনই কবি ঘৃণাভরে তাদের প্রতি অভিসম্পাত বর্ষণ করেছেন। কবিতার ভাষায় তিনি বলেন ‘ঐ নতুনের কেতন ওড়ে কাল বৈশাখীর ঝড়।/তোরা সব জয়ধ্বনি কর।’

১৯৭২ সালের ২৪ মে কবিকে সপরিবারে স্বাধীন বাংলাদেশে আনা হয়। বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে কবির অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৭৪ সালের ৯ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এক বিশেষ সমাবর্তনে কবিকে সম্মানসূচক ডি.লিট উপাধিতে ভ‚ষিত করে। ১৯৭৬ সালের জানুয়ারি মাসে নজরুলকে বাংলাদেশ সরকার বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান এবং ২১ ফেব্রুয়ারি ‘একুশে পদকে’ ভ‚ষিত করা হয়।

১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ অবিভক্ত বাংলার বর্ধমান জেলার চুরুলিয়ায় ‘জ্যৈষ্ঠের ঝড়’ হয়ে আবির্ভাব ঘটেছিল উনিশ শতকের অন্তিমলগ্নে যে কবির, সে ঝড় চিরতরে থেমে গিয়েছিল ঢাকার তৎকালীন পিজি হাসপাতালের কেবিনে ১৩৮৩ বঙ্গাব্দের ১২ ভাদ্রে। তিনি ‘দুখু মিয়া’র দুঃখ-দারিদ্র্যে জর্জর জীবন অতিক্রম করে বাংলা আর বাঙালির প্রাণের কবি হয়ে গেছেন।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনলেন তাকে। অধিষ্ঠিত করলেন ধানমণ্ডির ‘কবি ভবনে’। তিনি মহিমান্বিত হলেন বাংলাদেশের ‘জাতীয় কবি’ হিসেবে। ‘মসজিদেরই পাশে আমার কবর দিও ভাই’ গানের বাণীর এই আকাক্সক্ষা বাংলাদেশ ভোলেনি। কবির আকাক্সক্ষাই পূরণ করা হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদ প্রাঙ্গণে তাকে সমাহিত করে।





এই বিভাগের আরো সংবাদ




Leave a Reply

%d bloggers like this: