আজ: বুধবার | ৩০শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ | ১৫ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ | ১৩ই সফর, ১৪৪২ হিজরি | সকাল ৯:০৪
শিক্ষা

সেশনজটের আশঙ্কায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো

বাংলাদেশ বার্তা | ০৫ সেপ্টেম্বর, ২০২০ | ১:১৪ অপরাহ্ণ

করোনা ভাইরাসের কারণে বন্ধ রয়েছে সরকারি-বেসরকারি সকল বিশ্ববিদ্যালয়। প্রায় এক মাস বন্ধ থাকবে সব ধরনের একাডেমিক কার্যক্রম। দীর্ঘ এ বন্ধের কারণে ভয়াবহ সেশনজটে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে।

তারা মনে করছেন, সেমিস্টারভিত্তিক লেখাপড়ায় ছোট বন্ধও বড় প্রভাব ফেলে। কিন্তু করোনার কারণে সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে প্রায় একমাস বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এ বন্ধ আরও দীর্ঘ হতে পারে।

বিশ্বের অন্যান্য দেশ এ ধরনের সংকট মোকাবিলায় ‘অল্টারনেটিভ’ পদ্ধতি গ্রহণ করেছে। ডিজিটাল শিক্ষাব্যবস্থা ব্যবহারের মাধ্যমে ঘরে বসে একাডেমিক কার্যক্রম সম্পন্ন করছে। এদিক থেকে আমরা পিছিয়ে। ফলে নিশ্চিতভাবেই ভয়াবহ সেশনজটে পড়তে যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো।

জানা গেছে, দেশে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে গত ১৬ মার্চ প্রথম ধাপে ১৭ মার্চ থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করে সরকার।

কিন্তু করোনার বিস্তার বেশি হওয়ায় ৯ এপ্রিল পর্যন্ত এ ছুটি বাড়ানো হয়। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও পাঠদান থেকে বিরত রয়েছে।শুধু তাই নয়, করোনার কারণে পিছিয়ে গেছে এইচএসসি পরীক্ষা। বন্ধ রয়েছে এসএসসি পরীক্ষার ওএমআর শিট স্ক্যানিং।

এদিকে, অনাকাঙ্ক্ষিত বন্ধে শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ক্ষতি পুষিয়ে নিতে কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনলাইনে ক্লাস নিচ্ছে বলে জানা গেছে।

এছাড়া মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া চালু রাখার জন্য বিকল্প পদ্ধতিতে টেলিভিশনের মাধ্যমে লেখাপড়া চালানোর কার্যক্রম হাতে নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)।

এর অংশ হিসেবে বিষয়ভিত্তিক লেকচারগুলো বাছাই করে নির্বাচিত শিক্ষকদের দিয়ে ইতোমধ্যে রেকর্ড করে তা বাংলাদেশ টেলিভিশন ও সংসদ টেলিভিশনের মাধ্যমে সম্প্রচার করা হচ্ছে।

মাউশি সূত্রে জানা গেছে, সপ্তাহে সাতটি এবং মাসে ২৫টি ক্লাস প্রচার হবে। রোববার থেকে বৃহস্পতিবার প্রতিটি বিষয়ে ক্লাস সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত সম্প্রচার হবে। পরবর্তী সময়ে এগুলো মাউশির ফেসবুক পেজ এবং ইউটিউবে সংরক্ষণ করা হবে।

সেখান থেকে শিক্ষার্থীরা পরে পড়তে পারবে। সরকার এ পদ্ধতির নাম দিয়েছে ‘আমার ঘরে আমার ক্লাস’। প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্যও এসএমএস সার্ভিস শুরু করেছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়।

এক কোটি ৪০ লাখ শিক্ষার্থীর মায়ের মোবাইলে নিয়মিত এসএমএস দেয়া হচ্ছে। মায়েদের মোবাইলে পাঠানো এসএমএসে বলা হচ্ছে, এখন স্কুল বন্ধ থাকলেও রুটিন করে পড়ালেখা করতে হবে। বাইরে বের হওয়া যাবে না।

আর মা-বাবাদের শিশু ও শিক্ষার্থীদের প্রতি খেয়াল রাখতে হবে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া চালুর বিকল্প ব্যবস্থা নেয়া হলেও পিছিয়ে রয়েছে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। অনলাইন বা ভার্চুয়াল কোনো মাধ্যমেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পাঠদানের আওতায় আসেনি।

ফলে একাডেমিকভাবে পিছিয়ে পড়ছে শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীরা বলছে, আগামী ৯ এপ্রিল পর্যন্ত ইতোমধ্যে বন্ধ ঘোষণা করা হলেও ছুটি আরও বাড়তে পারে।

এছাড়া সামনে রোজা ও ঈদের ছুটি রয়েছে। করোনার বিস্তার না কমলে ছুটি আরও লম্বা হতে পারে। তাই আমরা সেশনজটে ইতোমধ্যে পড়ে গেছি।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান ও তথ্য ব্যবস্থপনা বিভাগের শিক্ষার্থী আরেফিন মেহেদী হাসান আমার সংবাদকে বলেন, কোভিড-১৯ এর মহামারি থেকে বাঁচতে এবং নিজেদের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বাংলাদেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের ঘোষণা দেয়া হয়েছে।

এতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ রয়েছে এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম কবে নাগাদ শুরু হবে সেটা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এমতাবস্থায় যথাসময়ে ক্লাস-পরীক্ষা অনুষ্ঠিত না হওয়ায় শিক্ষার্থীরা সেশনজটে পড়বে। যা তাদের ডিগ্রি অর্জনে বিলম্বসহ যথাসময়ে কর্মক্ষেত্রে যোগদান না করতে পারার প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়াবে।

তিনি আরও বলেন, এছাড়াও রুঢ় বাস্তবতা হলো শিক্ষার্থীরা তাদের মূল গবেষণা কার্যক্রমসহ, জ্ঞান তৈরি ও বিতরণের যে স্বাভাবিক কার্যক্রম আছে সেটা থেকে বঞ্চিত হবে। শুধু তাই নয়, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মাঝে মুক্ত জ্ঞানচর্চায় বাধা হয়ে দাঁড়াবে এই সংকট।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের শিক্ষার্থ সাইকি মিজান বৃষ্টি আমার সংবাদকে বলেন, করোনা ও করোনা পরবর্তী সময়কাল বাংলাদেশের জন্য ক্রান্তিকাল।

যেখানে উন্নত বিশ্ব তাদের যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা সত্ত্বেও এই করোনা ভাইরাস সংক্রমণ ও ঝুঁকি মোকাবিলা করতে সক্ষম হতে পারছে না, সেখানে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশ নিয়ে সত্যিকার অর্থেই দুশ্চিন্তা রয়েছে। একজন শিক্ষার্থী হিসাবে আমি মনে করি, এই করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের জন্য সেশনজট হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।

কারণ আমাদের বর্তমান ও আগামী ব্যবস্থাপনা এই ক্রান্তিলগ্ন মোকাবিলা করতে ঠিক কতটা কার্যকরী এই নিয়ে দেশের উচ্চস্তর হতে শুরু করে সাধারণ মানুষের ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিরাজ করছে নানা শঙ্কা। যার সমাধানের উপায় সম্পর্কে আমরা অধিকাংশ অজ্ঞাত।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক শাহ আজম শান্তনু আমার সংবাদকে বলেন, এ ধরনের সংকটগুলো অবশ্যই ধারাবাহিক একাডেমিক সিস্টেমকে বাধার সম্মুখীন করে।বিশেষ করে একাডেমিক সিস্টেম এখন সেমিস্টার ভিত্তিক হওয়ায় সামান্যতম বাধাই বৃহৎ আকার ধারণ করবে। এর জন্য জটের সম্মুখীন হতে পারে শিক্ষা কার্যক্রম।

তিনি বলেন, শুধু কোভিড-১৯ ই নয়, এ ধরনের সামাজিক, রাজনৈতিক এ সংকটগুলো মাঝে মধ্যেই হয়ে থাকে। এটা শুধু আমাদের নয়, এই সংকট সারাবিশ্বে বিরাজমান।

বিশ্বের অন্যান্য দেশ এ ধরনের সংকট মোকাবিলায় অল্টারনেটিভ পদ্ধতি গ্রহণ করেছে। ডিজিটাল শিক্ষাব্যবস্থা ব্যবহারের মাধ্যমে ঘরে বসে একাডেমিক কার্যক্রম সম্পন্ন করছে।

এদিক থেকে আমরা পিছিয়ে। দেশের নীতিনির্ধারকরা যদি শিক্ষাব্যবস্থা আধুনিকায়ন করার মাধ্যমে এই পরিবর্তনটি আনতে পারে তাহলে এ ধরনের সংকটকালীন সময় কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের ডিন ও শিক্ষক সমিতির সভাপতি মো. রশিদুল ইসলাম শেখ আমার সংবাদকে বলেন, করোনার কারণে সৃষ্ট সেশনজট কমিয়ে আনা সম্ভব।

কিন্তু কেউ মহামারিতে আক্রান্ত হলে তার ক্ষতিপূরণ কোনোভাবেই সম্ভব না। আমরা আশাবাদী, শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীরা আন্তরিক হলে অবশ্যই সেশনজট কমিয়ে আনা কোনো বিষয় না। করোনার বিস্তার আরও বৃদ্ধি পেলে সেশনজট বাড়বে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের শিক্ষার্থী আসিফ খান।

তার মতে, করোনা ঝুঁকি বাড়লে সেশনজট হবে, আর ঝুঁকি কমলে জট বাড়বে না। আমার সংবাদকে তিনি বলেন, করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ছুটি দিয়েছে। আগামী ৯ এপ্রিল পর্যন্ত যদি পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয় তাহলে সেশনজট হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে না বলা যায়।

তবে করোনা ঝুঁকি বেড়ে গেলে ঈদ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকতে পারে। যদি ঈদ পর্যন্ত বন্ধ থাকে তাহলে মার্চ, এপ্রিল, মে এই তিন মাসের অনেক ক্লাস পরীক্ষা বাদ পরে যাবে। ফলে এ সময় পূরণ করতে আরও সময় লেগে যাবে। তাই বলা যায়, করোনা ঝুঁকি বাড়লে সেশনজট হবে।

তবে ক্লাস পরীক্ষা বন্ধ হওয়ায় শিক্ষার্থীরা চিন্তায় পড়লেও তাদের চিন্তাগ্রস্ত হওয়ার কিছু নেই বলে জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান।

তিনি আমার সংবাদকে বলেন, আমাদের ছেলে-মেয়েরা করোনার কারণে সমস্যায় পড়ে গেল। যেহেতু এটা একটি জাতীয় সমস্যা তাই একে যেকোনোভাবেই হোক মোকাবিলা করতে হবে।

এ সমস্যা যখন শেষ হয়ে আসবে তখন আমাদের শিক্ষকরা বিষয়টির দিকে সদয় দৃষ্টি দেবেন। যাতে অতিরিক্ত সময় দিলে এই ঘাতটি পূরণ করতে পারি। আমরা যদি এক দুই মাস পিছিয়ে যাই করোনার কারণে তাহলে হয়তো সমস্যাটি সমাধানের জন্য আমাদের বিশেষ ড্রাইভ লাগবে।

অনলাইন ক্লাস নেয়ার ব্যাপারে তিনি বলেন, আমরা মোবাইল অপারেটরদের সাথে কথা বলছিলাম কিন্তু একেকজনের একেক নেটওয়ার্ক হওয়ার কারণে এটা সম্ভব হচ্ছে না।





এই বিভাগের আরো সংবাদ




Leave a Reply

%d bloggers like this: